শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
কেন ভারত থেকে কাশ্মির মুখ ফিরিয়ে
নীল সরকার
Published : Wednesday, 10 May, 2017 at 3:18 PM, Update: 18.09.2017 2:32:57 PM

কেন ভারত থেকে কাশ্মির মুখ ফিরিয়েঝড় থামার নাম নেই। সেই দু’হাজার আট সাল থেকে বিগত নয় বছরে কখনো ঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে, কখনো সাময়িক বিরতি দিয়ে আবার ঝাঁঝিয়ে উঠেছে। অশান্ত কাশ্মিরের কথা লিখছি। ২০০৮ সালে ও তার দু’বছর পর এমন ঝড় থামানোর জন্য নিরাপত্তারক্ষীরা বেছে নিয়েছিলেন, পাথরের বদলে পাটকেল নয়, বন্দুকের গুলি। ফলে ঝরে যায় বেশ কিছু তাজা প্রাণ। সিদ্ধান্ত হয়, এটা কোনো কাজের কথা নয়। গুলি থামে, আসে পেলেট। সে -ও ঝকমারি কম নয়। চোখে, নাকে বিঁধে আন্দোলনকারীরা নাকাল। ডাক্তারবাবুরা চোখ থেকে পেলেটের টুকরো বের করতে নাজেহাল। শোনা কথা পেলেটবিদ্ধ একটা চোখও নাকি স্বাভাবিক হয়নি। একে তো ক্ষোভ রয়েছে, তার ওপর এমন শারীরিক ক্ষতি। বিশেষজ্ঞদের মতে আগুনে ঘি! এই সব নিয়ে বিস্তর মামলা চলছে। তবে মামলায় চর্চা চলছে কী দিয়ে পাথর ছোড়া ছোকরাদের শায়েস্তা করা যাবে। কিন্ত্ত তারা পাথর ছুড়ছে কেন ? 

নিরাপত্তারক্ষীদের এমন পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা কী ?পাথর ছুড়ছে কেন তার টুকরো-টুকরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কেউ বলছেন, টাকা দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে চাঁদমারি করা হচ্ছে। তবে টাকাটা দিচ্ছে কে? উদ্দেশ্যটা কী ? সেটা কেন আটকানো যাচ্ছে না ? লাখ টাকার প্রশ্ন। 

মজার কথা এমন বিক্ষোভের কোনো নেতা নেই। কাজেই কথা বলে নিষ্পত্তির সুযোগ কম। পাথর ছোড়ার বহর দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, চোখ বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাথর ছোড়ার মতো যুবকের অভাব নেই। পরিষ্কার সিদ্ধান্ত, যুবকদের চাকরি নেই, বেকার, পাথর ছোড়ার অবসর রয়েছে। সেটা দূর করার কাজ তো নিরাপত্তা বাহিনীর এক্তিয়ারে পড়ে না। সেটা রাষ্ট্রের কর্তব্য। বিগত আড়াই দশক ধরে জঙ্গি হামলার মধ্যে বড়ো হওয়া যুবকদের একাংশের মনে সুরক্ষা কর্মী -বিরোধী মানসিকতা গেড়ে বসেছে। শিক্ষিত যুবকরাও এমন পাথর ছোড়ায় পিছিয়ে নেই। তবে বুঝতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ রয়েছে। রয়েছে জন সংযোগের অভাব। মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো জনমানসে যে শূন্যতা রেখেছে তার পরিণাম। যারা ভারতীয় সংবিধান মেনে রাজনীতি করেন, তাদের সঙ্গে কাশ্মিরের এক অংশের বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট। সেই মওকা কাজে লাগাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ। 

এবার নিরাপত্তারক্ষীদের সমস্যা দু’ধরনের। প্রথমত, তাদের সীমানা টপকে আসা জঙ্গিদের মোকাবিলা করতে হয়। অন্য দিকে পাথর হাতে মারমুখী জনতা। দু’ধরনের চরিত্রে আকাশ -পাতাল ফারাক। জঙ্গি মোকাবিলায় গুলি -বন্দুকের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন নেই। সেই একই সিপাই যখন উন্মত্ত জনতার সামনে পড়ে হিসাবটা অন্য রকম হয়ে যায়। জঙ্গি মোকাবিলার ঢঙে ক্ষিন্ত জনতাকে সামলানো যায় না। একই বাহিনী কি দু’রকমের ব্যবহারে সমান পারদর্শী ? সমস্যাটা এখানেই। গুলি বা পেলেট ছোড়ার ঘটনায় দেখুন, রাজ্য পুলিশ নয়, কেন্দ্রীয় বাহিনী বেশি জড়িয়ে পড়ে। কারণ তারা স্থানীয় মানুষের নাড়ির হদিস পায় না। কী করে পাবে বলুন তো? ছিল হয়তো ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী ঠেকানোর কাজে, রাতারাতি ঠেলে দিল কাশ্মিরে। 

ভারতের প্রত্যেক অঞ্চলের ক্ষিপ্ত জনতার ব্যবহার সুরক্ষা -কর্মীদের প্রতি সমান ভাবলে বড়ো ভুল হয়ে যাবে। কারণ, সমাজ -সংস্কৃতি, মানসিকতা ভিন্ন। কাশ্মিরকে আমরা যতই অবিচ্ছেদ্য অংশ বলি না কেন, কাশ্মিরের বহু মানুষ বেড়াতে গেলে বলেন, ‘ভারত থেকে এসেছেন ?’ সাত দশক পরেও এই মানসিকতায় কেন বদল এলো না ? সেই প্রদেশের জনতা কী করে ভিন প্রদেশের জওয়ানের কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আপন ভাববে ?স্থানীয় থানাগুলো উগ্রপন্থী হামলা ঠেকাতে দুর্ভেদ্য দুর্গ। থানার প্রাচীরের মতন জনতার সঙ্গে মানসিক ব্যবধান দুস্তর। সাধারণ মানুষের সঙ্গে থানার সম্পর্ক কেমন ? খুব জটিল প্রশ্ন। থানা নিচু স্তরের সরকার। সাধারণ মানুষের যোগাযোগ টু-জি মাপের, ক্ষীণ। ফলে জনতার মানসিকতা টের পায় না। পুলিশ সারা ভারতে জনতার শাসক ভাবে। কোথাও ভাবে না সে পরিষেবা দিচ্ছে। কাশ্মিরও তার ব্যতিক্রম হবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। থানা যে সুরক্ষা ও মঙ্গলের জন্য এই অনুভূতি জনমানসিকতায় গরহাজির। কী করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হবে জনতা -পুলিশে ? এই খামতির জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নামানো হয়। তাদের নজরে স্থানীয় মানুষ অজানা। তারা জঙ্গি সামলে হাত মকশো করেছে। ফলে, মুখের থেকে বন্দুক বেশি সচল। তাদের উপর জনতার আস্থা কী করে আসবে ? অথচ জনতা -পুলিশে আস্থা ভীষণ জরুরি। 

সমাধান কী ?
পেলেট বা বুলেট গত নয় -বছরে প্রচুর খরচ হলো। শান্তি এলো না। রাজ্য পুলিশ, কাশ্মিরের ভূমিপুত্র। তাদের দিয়ে পাথর ছোড়া ঠেকানো হোক। তারা স্থানীয়দের বোঝেন। পরিচিত মুখ, জনতার আস্থা ফিরবে। প্রশাসন ও জনতার বন্ধন একান্ত প্রয়োজন। এটা ছাড়া শান্তি, এই গ্রহের ইতিহাসে বেশ বিরল। বল প্রয়োগে বরং ক্ষোভ বাড়বে। পেলেট ছুড়ে আর যাই হোক জনতার মনের পরিবর্তন আসে না। মোকাবিলার জন্য স্থানীয় মূল ধারার জননেতাদের সামিল করা হোক। তারা ঘটনাস্থলে পুলিশের সঙ্গে যাবেন। আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে মানসিকতা বিশ্লেষণ করা হোক। প্রজন্ম ধরে পাথর ছোড়ার অভ্যাস কেন হচ্ছে জানাটা জরুরি। 

সকল পক্ষের মত নিয়ে একটা স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন পদ্ধতি করা হোক। কী ভাবে মোকাবিলা উচিত এটা জানা দরকার। সিপাইদের এই ধারণা দেওয়াটা খুব আবশ্যক যে পাথর যারা ছুড়ছে তাদের সঙ্গে লড়াই হচ্ছে না। তারা সহ -নাগরিক। শত্রæ নয়। মার্কিন দেশে এমন মানসিকতা পরিবর্তন করে পুলিশের কথায় -কথায় গুলি চালানোর ঘটনা বেশ কমে গিয়েছে। 

এর পর আসছে সিপাইজিদের নিরাপত্তা। সুরক্ষা -কর্মীরা যা করেন নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে। সুরক্ষা -কর্মী আহত হলে শুধু তাদের নয়, জনতার আস্থায় চিড় ধরে। পাথর যারা ছোড়ে তারা কিন্ত্ত পুলিশকে গুলি করে না। এটাও বলা যাচ্ছে না জোর করে, কোনো বৃহৎ চিন্তাভাবনা থেকে করছে, তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ঘটছে। তাদের ক্ষোভটাকে শত্রুরা ব্যবহার করছে। আমরা কেন সেটা করতে দিচ্ছি ? যারা সব কিছু করার পরও শুধরাবে না তাদের জন্য পাতা শেল বা বাজে গন্ধের আয়োজন করা যেতে পারে। রয়েছে বন্য জন্তুকে জব্দ করার জাল দিয়ে ঘেরার বন্দুক। জল কামান তো বেশ পরিচিত অস্ত্র। না হলে পুলিশ দিয়ে ঘিরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। 

পাথর ছোড়ার যুবকদের সংখ্যা যেকোনো ঘটনায় খুব জোর শত খানেক হয়। সামাজিক ভাবে এই সব যুবকদের চিহ্নিত করা সম্ভব। তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে সেই যুবকদের সুপথে ফিরিয়ে একেবারে অসম্ভব নয়। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে অপপ্রচার বন্ধ করা। জনপ্রিয় তারকা বা খেলোয়াড়দের কাজে লাগানো উচিত। ধর্মীয় গুরু, শিক্ষক, চিকিৎসকদের কেন ময়দানে নামানো হচ্ছে না ? সমাজে তারা দারুণ প্রভাব রাখেন। 

এই পাথর ছোড়া প্রজন্মের মানসিকতা না বদলালে পরের প্রজন্ম অবধি এই অশান্তি গড়াবে। বিগত সাত দশকে কেন কাশ্মিরের মানুষের মনের নাগাল পাওয়া গেল না এটা বিশ্লেষণ করা জরুরি। সময় দাঁড়িয়ে থাকে না। সুযোগ এখনও আছে। পেলেট দিয়ে নয়। আপন করে, উন্নয়ন দিয়ে মন জয় করুন। মানুষ উন্নয়নের স্বাদ পেলে প্রস্তর যুগে খামোখা পড়ে থাকবে কেন ?

নীল সরকার: ভারতীয় সাংবাদিক

৭১সংবাদ ডট কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


সর্বশেষ সংবাদ
দ্বিতীয় ম্যাচেই সাকিবদের হার
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
ছায়েদুল হকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
জামায়াতের বিষয়ে একটা জটিলতা আছে : কাদের
মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে স্পিকারের শোক
স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগের আহ্বান
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবিতে বেরোবিতে নীলদলের মানববন্ধন
‘টি-টেন’ টুর্নামেন্টের সময়সূচি
ফেঁসে গেলেন মোস্তাফিজ
আনুশকা-বিরাটের আয় কত?
সানি লিওনের ‘ভয়ে কাঁপছে’ ভারত সরকার
ঈশ্বরদী-পাবনা ট্রেন চলাচল শুরু
রাম সেতু মানুষের তৈরি!
Chief Advisor: A K M Mozammel Houqe MP
Minister, Ministry of Liberation War Affairs, Government of the People's Republic Bangladesh.
Editor & Publisher: A H M Tarek Chowdhury
Sub-Editor: S N Yousuf
Chief Reporter: Nazmul Hasan Babu
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ৭১সংবাদ, ২০১৭
প্রধান কার্যালয় : ৫৩, মডার্ন ম্যানশন (১৪তলা), মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০
বার্তাকক্ষ : +৮৮-০২-৯৫৭৩১৭১, ০১৬৭৭-২১৯৮৮০, ০১৬২২-৩৩৩৭০৭, ০১৮৫৫-৫২৫৫৩৫, ই-মেইল :71sangbad@gmail.com, news71sangbad@gmail.com, Web : www.71sangbad.com